An IIPM Initiative
বৃহস্পতিবার, এপ্রিল 24, 2014
 
 

মমতার ‘নব’ রত্ন...

 

অরুণাংশু ভট্টাচার্য ও সুকুমার মিত্র | জুন 23, 2011 11:38
 

সার্থক পরিবর্তন’-এর সূত্রকে আস্হা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নতুন সরকার রাজ্যের মানুষকে যে-স্বপ্ন দেখাতে বদ্ধপরিকর, সেখানে সৌজন্য তার একটি বিশেষ উপাদান৷ সরকার গঠনের একমাসেরও কম সময়ের মধ্যেই তার পরিচয় মানুষ বেশ ভালোভাবেই পেয়েছেন৷ একইসঙ্গে লক্ষ করেছেন বিভিন্ন সরকারি সংস্হার মাথায় আসীন থাকা বাম বুদ্ধিজীবীদের পদত্যাগের ঘটনা৷ এরই পাশাপাশি সাধারণ মানুষ সাগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন নতুন সরকার এই সমস্ত সংস্হাগুলির প্রধান হিসাবে কাদের মনোনীত করে৷ এখানেও দলাদলির ঊধের্ব গিয়ে তাঁর সেই অননুকরণীয় সৌজন্যের পরিচয়ই রাখলেন রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

আমরা-ওরা’--- এই বিভাজনতত্ত্ব যে তাঁর অভিধানে নেই, সেটা প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন সরকারি সংস্হার জন্য মনোনীত কমিটিতে বামপন্হী বুদ্ধিজীবীদেরও সম্মানের সঙ্গে স্হান দেওয়ায়৷ যেমন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির চেয়ার পার্সন হিসাবে নির্চিত হয়েছেন প্রথিতযশা লেখক মহাশ্বেতা দেবী৷ তারপর বিভিন্ন সরকারি সংস্হার প্রধান হিসাবে যাঁদের মনোনীত করা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচেছ দলীয় পক্ষপাতকে দূরে সরিয়ে একটি ভারসাম্যের আবহ এবং সঠিক কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চান মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী৷

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এমনই একটি সংস্হা যে, এটিকে ঘিরে সংস্কৃতি-প্রিয় মানুষের প্রত্যাশা প্রচুর৷ তার সভাপতি করা হয়েছে এমন একজন স্টলওয়ার্টকে, সাহিত্যিক এবং সমাজকর্মী হিসাবে যিনি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম৷ এ-ছাড়া বাংলাভাষায় মোট পাঁচজন জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্তের মধ্যে একমাত্র জীবিত লেখক৷ তো  বাংলা আকাদেমির সভাপতি-পদে তাঁর চেয়ে যোগ্য এই মুহূর্তে কে আছেন? মহাশ্বেতাদেবীকে বাংলা আকাদেমির সভাপতি নির্চন করার পর আমরা গিয়েছিলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে৷ প্রথমেই  জানালেন যে, তিনি এখনও সরকারিভাবে দায়িত্ব নেন নি কিন্তু এতদিন যে-ভাবে চলেছে, আগামিদিনেও যে সে-ভাবে চলবে এমন কোনও কথা নেই৷ শুধু বাংলা আকাদেমি কেন, রাজ্যের এ-জাতীয় প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানেই দলতন্ত্রকে প্রাধান্য দেওয়া, ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ যেন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ যার ফলে কোনও গঠনমূলক বা অ্যাকাডেমিক কাজ দূর অস্ত৲, রাজ্যের সংস্কৃতির আবহটাকেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে৷ তাঁর স্পষ্ট কথা–‘আমাদের একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে৷

আমরা তাঁকে বাংলা আকাদেমি সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে ওঠা নানা অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম৷ তার উত্তরে তাঁর বত্তুব্য, ‘এ-রকম অভিযোগের কথা আমি অনেকদিন ধরেই কিছু কিছু শুনেছি৷ কিন্তু তোমরা যা বললে, তাতে তো বিষয়টা অত্যন্ত ভয়াবহ বলে মনে হচেছ৷আমাদের প্রশ্ন ছিল, দায়িত্বগ্রহণের পর আপনি কি এইসব ব্যাপার খতিয়ে দেখবেন? তিনি জানালেন,‘অবশ্যই দেখব৷ তোমরা আমাকে সাহায্য করবে তো?’ কথাপ্রসঙ্গে বাংলা আকাদেমির 25 বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হয় নি, এই তথ্যটি ওঁকে জানাতেই তিনি অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন –‘কেন? এটা তো একটা সংস্হার পক্ষে গৌরবময় ব্যাপার! ইলেকশনের সঙ্গে আকাদেমির রজতজয়ন্তী উদ৲যাপন করা না-করার কী সম্পর্ক? আর, 25 বছর তো কম কথা নয়! যদি কাজ করার ইচছা থাকে, তাহলে এই সময়ের মধ্যে প্রচুর কাজ করা যায়৷ দ্যাখো, ঢাকার বাংলা আকাদেমি যে-ভাবে কাজ করেছে বা  করছে, এখানে কেন সে-রকম হবে না? আমাদের অনুবাদের কাজ অবহেলিত, লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা বা সেই সম্পর্কিত পুস্তক প্রকাশ কিংবা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়নএই জাতীয় কাজই তো আকাদেমির করা উচিত৷ সেখানে একগাদা পুরস্কার দেওয়ার কোনও যৌত্তিুকতা নেই৷

আমরা তাঁর কাছে আরও প্রশ্ন রেখেছিলাম যে, উত্তরবঙ্গে বাংলা আকাদেমির একটি শাখা হতে পারে কিনা৷ তাঁর বত্তুব্য, ‘উত্তরবঙ্গে তো বটেই, প্রতিটি জেলায় এর একটি করে শাখা স্হাপন করা যেতে পারে৷ এর এমন একটা স্ট্যাটুটরি বডি তৈরি করা দরকার যে, সরকারের অধীনে থেকেও আকাদেমি যেন স্বাধীন সংস্হার মতো কাজ করতে পারে৷ আর, যে-সব কাজ এতদিন বাংলা আকাদেমিতে হয়েছে, তার বাইরেও প্রচুর কাজ আছে৷ এতদিন যা হয়েছে তার অর্ধেকের বেশিই তো অ-কাজ৷ তোমাদের উপযুত্তু সহযোগিতা পেলে আশা করছি বাংলা আকাদেমি কিছুকালের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে৷ একটিমাত্র বাড়ির মধ্যে তার কাজের পরিধি আটকে থাকবে না৷

বাংলা আকাদেমি নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর এ-হেন চিন্তাভাবনার পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য সংস্কৃতি-সংস্হাগুলির চেয়ারপার্সন হিসাবে যাঁদের মনোনীত করা হয়েছে, তাঁদের তালিকা এইরকম৷ রবীন্দ্রসদনের দায়িত্বে এসেছেন সুমিত্রা সেন৷ নন্দন কমিটির সভাপতি সন্দীপ রায়৷ একইসঙ্গে বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হিসাবে কমিটিতে রাখা হয়েছে তরুণ মজুমদারকে৷ উল্লেখ করা যেতে পারে, এই তরুণবাবুই গত বাম আমলে নন্দন কমিটির সভাপতি ছিলেন এবং নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন৷ এঁরা ছাড়াও এই কমিটিতে আছেন অপর্ সেন, মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়৷ চলচিচত্র উৎসব কমিটির দায়িত্ব পেয়েছেন রঞ্জিত মল্লিক৷ আবার কলকাতা ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউটের সভাপতি হয়েছেন রাজ্যের উচচশিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু৷ শাঁওলি মিত্রকে মনোনীত করা হয়েছে রবীন্দ্র জন্মসার্ধশতবর্ষ উৎসব কমিটির সভাপতি হিসাবে৷ এর পাশাপাশি নজরুল অ্যাকাডেমির সভাপতি করা হয়েছে জয় গোস্বামীকে, সহ-সভাপতি হিসাবে মনোনীত হয়েছেন অনুপ ঘোষাল৷ রাজ্য সংগীত অ্যাকাডেমির সভাপতি হয়েছেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়৷ প্রতিক্রিয়া জানতে আমরা ফোন করেছিলাম তাঁকে৷ তিনি অত্যন্ত মার্জিতভাবে আমাদের জানালেন যে, যেহেতু এখনও তিনি ওই সংস্হাটির কর্মসংস্কৃতি কী পরিস্হিতিতে আছে তা সম্যক জানেন না, তাই এ-বিষয়ে এখনই কোনও কথা তিনি বলতে চান না৷ তবে সংগীত অ্যাকাডেমির কাজ যাতে আরও বিস্তৃত হতে পারে, সে-জন্য অবশ্যই তিনি চেষ্টার ত্রুটি রাখবেন না৷ এমনই প্রতিক্রিয়া ফোনে জানিয়েছিলেন নজরুল অ্যাকাডেমির সভাপতি জয় গোস্বামী৷ তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন, এখনও তিনি সরকারি চিঠি হাতে পান নি৷ তাই সংগতকারণেই ওই কমিটির সদস্য কারা হবেন, তা তাঁর জানা নেই৷ একইসঙ্গে বর্তমান প্রতিবেদককে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ‘কমিটি গঠন হলে আকাদেমির জন্য কী কী পদক্ষেপ বা কর্মসূচি নেওয়া হবে তা আমি অবশ্যই জানাব৷’  পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির সভাপতি হিসাবে নির্চিত করা হয়েছে মনোজ মিত্রকে৷ এই কমিটিতে যাঁদের সদস্য করা হয়েছে, এই কপি লেখা পর্যন্ত তাঁদের নাম আমাদের কাছে এসে পৌঁছয় নি৷

রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি নতুন করে প্রকাশ বাম সরকারের একটি কর্মসূচিছিল৷ কিন্তু তারা তা সম্পূর্ণ করে উঠতে পারে নি৷ ওই কমিটির দায়িত্বে ছিলেন বাম-মনোনীত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী৷ কাজটি যাতে ঠিকঠাকভাবে এগোতে পারে, তার জন্য ওই কমিটির সভাপতি পদে পুনরায় নির্চিত করা হয়েছে শ্রীচক্রবর্তীকেই৷ ওই কমিটির সহ-সভাপতি হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে শঙ্খ ঘোষকে৷ এই কমিটিতে অন্য সদস্য, যাঁদের থাকার সম্ভাবনা, তাঁরা হলেন অনাথনাথ দাস, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, স্বপন মজুমদার প্রমুখ৷ একইসঙ্গে এখানে আর একটি তথ্য দেওয়া দরকার যে, গত বাম-জমানায় বাংলা আকাদেমির সভাপতি ছিলেন এই৻ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীই৷ তাঁকে এবার বাংলা আকাদেমির সহ-সভাপতির পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিন্তু তিনি ওই পদ গ্রহণে তাঁর অসম্মতি জানিয়েছেন৷

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্তিক শিক্ষা মানচিত্রে তুলে ধরার প্রয়াস হিসাবে সরকার একটি মেন্টর গ্রুপ গড়ছে৷ যার মুখ্য উপদেষ্টা মনোনীত করা হয়েছে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে৷ যিনি পরিষ্কার বাম বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত৷ ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান হচেছন হার্র্ড ইউনিভারসিটির অধ্যাপক সুগত বসু৷ এর পাশাপাশি সৌজন্যের অনন্য নজির দেখিয়ে রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন করা হয়েছে প্রাত্তুন মন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর স্ত্রী সুনন্দা মুখোপাধ্যায়কে৷ 

বিভিন্ন সংস্হার প্রধান হিসাবে যাঁদের নাম জানা গিয়েছে, তাঁদের প্রাথমিক মনোনয়ন প্রায় ঠিক হলেও কমিটিগুলির অন্য সদস্যদের তালিকায় কিছু রদবদল ঘটতেই পারে৷ মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় এখনও সমস্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন নি৷ অতএব চূড়ান্ত করে এখনই কিছু বলা যাচেছ না৷ তবে দলতন্ত্রের ঊধের্ব গিয়ে রাজ্যের সংস্কৃতিক্ষেত্রে তিনি যে সুস্হ বাতাবরণ ফিরিয়ে আনতে চাইছেন, সে-সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই৷  

নিবন্ধটি কেমন লাগল:
মন্দ ভালো    
বর্তমান রেটিং 2.0
Post CommentsPost Comments




প্রকাশের তারিখ: ফেব্রুয়ারী 10, 2013

ফোটো
ঈদের নমাজ
রাজ্যবাসীকে ঈদ-উল-ফেতার এর শুভেচ্ছা
কলকাতার জামে মসজিদ
বিজয় উত্সব